আদিবাসীদের চৈত্র সংক্রান্তি: বিঝু (চাকমা পর্ব)

Shagatom Chakma

Photo Credit: Bhubon Chakma

শীতের রুক্ষ পাতাঝরা দিনের পরে প্রকৃতিতে যখন বসন্ত আসে, তখনই প্রকৃতি এক নতুনত্বের বার্তা দেয়। ফুল ফোটে, পাখি গান গায়, কোকিলের কুহু কুহু শব্দে ঋতুরাজ বসন্ত পৃথিবীতে আনন্দের দোলা দিয়ে যায়। ঋতুরাজ বসন্তের বিদায় এবং নববর্ষ বরণ নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আদিবাসীরা বৈসু-বিহু-বিষু-বিঝু-সাংগ্রাই-সাংক্রান উৎসব পালন করে থাকে। তার মধ্যে “চাকমা” জনগোষ্ঠীর “বিঝু” উৎসব অন্যতম। 

“হোই দোগোয় হোগিল্লোরে,

আভা ফিরের হিলো উগুরে

বিঝু এজের সেই লগে, 

নুও বজরে” 

– চাকমা ভাষার এ গানের বাংলা ভাবার্থ- “কোকিলকে বলে দিও, পাহাড়ে ফাগুনের বাতাস বইছে, বিঝু্র সাথে সাথে নতুন বছরও আসছে। “বিঝু” চাকমা সমাজের সবচেয়ে বৃহৎ সামাজিক উৎসব। চাকমা জনগোষ্ঠী চৈত্র মাসের শেষ দুইদিন এবং নববর্ষের প্রথম দিন “বিঝু” উৎসব পালন করে থাকে। চাকমারা চৈত্রের শেষ দুই দিন ফুলবিঝু, মূলবিজু এবং নববর্ষের প্রথম দিন তারা “গইজ্জ্যা-পইজ্জ্যা দিন” নামে পালন করে থাকে। কোকিল ডাকা বসন্তকে বিদায় জানাতে চাকমা জনগোষ্ঠী বিঝুকে ঘিরে পাড়ার ক্লাব ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন খেলা, আবৃতি, সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। তার মধ্যে ঘিলা খেলা, নাদেং খেলা, ফুত্তে খেলা, থুম্ব্রু খেলা ( পাহাড়ি বৈদ্যদের এক ধরনের তন্ত্র-মন্ত্র খেলা। যেখানে বৈদ্যরা মন্ত্র গুণে তার প্রতিপক্ষকে বিভিন্ন ধরনের বশ করে। যেমনঃ-  যদি বানর হওয়ার জন্য মন্ত্র করে তাহলে প্রতিপক্ষ বানরের মত আচরণ করে। এভাবে পাল্টাপাল্টি আক্রমণ করার পর যতক্ষণ পর্যন্ত হার স্বীকার না করে ততক্ষণ পর্যন্ত চলতে থাকে), গুদু খেলা, ফোর খেলাসহ, উভগীত, গেংখুলী গীতের আয়োজন অন্যতম। এছাড়াও ঘিলা লতা/ দড়ি দিয়ে তৈরি দোলনায় যুবক যুবতীরা ও ছেলেমেয়েরা  দোল খায়। বিঝু উৎসবের দিন চলে আসার আগ থেকে চাকমা সমাজে এক ধরনের সাজ সাজ ভাবের সৃষ্টি হয়। চলুন জেনে নিই ফুলবিঝু, মূলবিজু আর গইজ্জ্যা-পইজ্জ্যা দিন  নিয়ে গঠিত চাকমা জনগোষ্ঠির বিঝু উৎসবের কথা।

ফুল বিঝুঃ চৈত্র মাসের ৩০ তারিখ চাকমারা ফুল বিঝু পালন করে থাকে। ফুল বিঝুর দিনে চাকমা জনগোষ্ঠীর লোকজন খুব ভোরে দলে দলে মিলে বাগান থেকে ফুল সংগ্রহ করতে যায়। ফুল সংগ্রহের পরে তারা সারা বাড়ি ফুল দিয়ে সাজাতে থাকে। ফুল দিয়ে বাড়ি সাজানোর পরে তারা ছড়া (পাহাড়ী ঝর্ণা), কুয়া ঘাট, গাঙের (নদী) পাড়ে গিয়ে গঙ্গা মা’র উদ্দেশে ফুল দেয়, যাতে তারা পুরাতন বছরের মতো বা তার চেয়ে আরো সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারে। তবে বর্তমানে চাকমা সমাজ শিক্ষা বিস্তারের ফলে সচেতন হওয়ায়, তাদের অনেকেই গঙ্গা মা’য়ের পরিবর্তে উপগুপ্ত ভান্তের উদ্দেশ্যে করে ফুল দেয়। এছাড়াও চাকমারা এ দিন নদীতে বা ছড়ায় গোসলের সময় পানিতে ডুব দিয়ে “বিঝুগুলো” খুঁজে থাকে( যা একটি রুপক মাত্র)। সেদিন তারা সকালে ফুল দিয়ে গোসল করে। চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, ফুলবিঝুর দিনে তারা বুদ্ধের কাছে সকলের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করে।এ দিন তারা বাড়ির কিংবা গ্রামের বৃদ্ধ লোকজনদের তারা কুয়া/টিউবওয়েল থেকে পানি এনে পা ধুয়ে দেয়/গোসল করিয়ে দেয় এবং আশীর্বাদ নেয়।

মূল বিঝুঃ চৈত্রের শেষ দিনে চাকমা জনগোষ্ঠী “মূলবিঝু” পালন করে। মূলবিঝুর দিনে গ্রামে গ্রামে/ বাড়িতে বাড়িতে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন হয়। এ দিন ছোট-বড় সকলে ঐতিহ্যবাহী পোষাক পড়ে  পাড়ার এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি ঘুরে বেড়ায়, আনন্দ-উল্লাস করে। বিঝুর দিনে প্রত্যেক বাড়িতে অতিথি আপ্যায়ন করা হয়।  বিঝুতে কাউকে নিমন্ত্রণ করা হয় না কারণ এদিন ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই আমন্ত্রিত। সকলের বাড়ির দরজা ধনী-গরীব সকলের জন্য খোলা, সবাই অতিথি। এর ফলে সকলের মধ্যে আত্মীয়ের বন্ধন আরো দৃঢ় হয়।এমন ও দেখা যায় যে পুরো বছরে একবারও কোন বাড়িতে ঘুরতে যাওয়া হয়নি কিন্তু এদিন যাওয়া হয়। এ দিন প্রত্যেকের বাড়িতে ঐতিহ্যবাহী “পাজন” তরকারি রান্না করা হয়। পাজন মূলত বহু ধরনের সবজির মিশ্রণে তৈরি একটি তরকারি। কথিত আছে যে, কমপক্ষে ২২ রকমের সবজির মিশ্রণ না থাকলে  তা পাজন তরকারি হবে না। পাজন মূলবিঝুর খাদ্য তালিকায় প্রধান উপকরণ। পাজন ছাড়াও সেমাই, মটর বুট, চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী পিঠা-বরা পিঠা, সান্নে পিঠা, বিনি পিঠা, বিভিন্ন ফল-ফলাদির সমাহার থাকে। বিজুকে কেন্দ্র করে ভাত থেকে বানানো হয় এক ধরনের মদ, জগরা, হানজি।  বিঝুর দিনগুলোতে অবাধে মদ্যপান চললেও বর্তমান সমাজে শিক্ষা বিস্তার লাভ করায় তা অনেকটা নিরুৎসাহিত করা হয়।

গইজ্জ্যা-পইজ্জ্যা দিনঃ বৈশাখ মাসের প্রথম দিন অর্থ্যাৎ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনকে চাকমারা “গইজ্জ্যা-পইজ্জ্যা দিন” নামে পালন করে থাকে। চাকমা পুরান মতে, মূলবিঝুর দিনে চাকমারা এতো খাওয়া-দাওয়া করে যে নববর্ষের দিনে তারা শুধু শুয়ে থাকে বা বিশ্রাম নেয়, এই অর্থ বুঝাতে তারা নববর্ষের দিনকে গইজ্জ্যা-পইজ্জ্যা দিন বলে অভিহিত করে। আগেকার দিনে, চাকমারা গইজ্জ্যা-পইজ্জ্যার দিনে বিভিন্ন ধরনের  মাংস দিয়ে আহার করতো, যাতে তারা সারা বছর ভালো খাবার দিয়ে তাদের আহার করতে পারে, এমন প্রত্যাশার বিশ্বাস  তাদের মধ্যে ছিল। অনেকে গঙ্গা মা’কে পূজা করতো। তবে বর্তমান চাকমা সমাজে শিক্ষা বিস্তারের প্রভাবে এ বিষয়গুলো নেই বললেই চলে এবং অনেকে এসব বিষয় কুসংস্কার বলে মনে করে। তবে এ দিন চাকমা জনগোষ্ঠীর যার যার পরিবারের সকলে মিলে “বৌদ্ধ বিহারে” যায়। বিহারে বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকে। সেই ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গ্রামের সকলে সমবেতভাবে বুদ্ধের কাছে প্রার্থনা করে যাতে সুখে শান্তিতে দিনযাপন করতে পারে। তবে অনেকে ব্যাক্তিগত উদ্যেগে পরিত্রাণ/মঙ্গল সূত্র শ্রবণ করে থাকে।  ছোটরা পরিবারের জ্যৈষ্ঠ সদস্যদের পা ধরে প্রণাম করে। এছাড়াও এদিন বিকালে গ্রামের মধ্যে ছোটরা সকলের বাড়ি বাড়ি ঘুরে জ্যৈষ্ঠদের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেয়।

চাকমা সমাজের সবচেয়ে বৃহৎ এই বিঝু উৎসব, চাকমা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির জানান দেয়। শেখরের সাথে একটি জনগোষ্ঠির মেলবন্ধনের মাধ্যমে একটি জাতির আত্মপরিচয় ঘটে। বিঝুর এই আনন্দের ঘনঘটায়, মঙ্গল বয়ে আনুক পৃথিবীর সকলের।

 309 total views,  2 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published.