চাকমা সাহিত্যের ক্ষণজন্মা কবি সুহৃদ চাকমার সংক্ষিপ্ত জীবনী

কবি সুহৃদ চাকমা ১৯৫৮ সালের ২০ জুন খাগড়াছড়ি জেলার দিঘীনালা থানাধীন বাঘাইছড়ি দোর নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাকনাম লককন।  পিতা প্রফুল্ল কুমার চাকমা, মাতা দেনি চাকমা।প্রফুল্ল ও দেনি দম্পতির সাত সন্তান-সন্ততির মধ্যে সুহৃদ দ্বিতীয় সন্তান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় হতে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তিনি আলবেরুনী হলের ২২৯-ঘ নং কক্ষে থাকতেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে “বনফুল” নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন অনুমতি বিহীন ছাপানো নিয়ে সচিবালয়ে তার নামে অভিযোগ করা হয়েছিল।

১৯৮১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী শুক্রবার বিকেল ৪ টায় তৎকালীন ঢাকার স্যার সৈয়দ রোডস্থ ট্রাইবেল স্টুডেন্টস হোস্টেলে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়, সেই সভায় রা-ক (Rangamati Aesthetics Council) গঠন করা হয়। রা-কের মূল উদোক্তা ছিলেন সুসময় চাকমা ও সুহৃদ চাকমা। তারা দু’জনেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। সুসময় চাকমা ভূগোল বিভাগে পড়াশোনা করতেন।রা-কের গঠনতন্ত্রের আদর্শ ও লক্ষ্যে বলা হয়েছিল- রাক যেহেতু একটি নান্দনিক পর্ষদ সেহেতু এই পর্ষদ বিশ্বাস করে যে শিল্প শিল্পের জন্য,জীবনের জন্য এবং মানবতার জন্য। রা-ক যে সংগঠনটি বর্তমানে জাক (Jum Aesthetics Council) নামে পরিচিত।

১৯৮২ সালের ৩১ শে জানুয়ারী বনরুপা নিবাসী ব্রজেন্দ্র তালুকদার ও ঝর্ণা তালুকদারের মেয়ে অর্চনা তালুকদারের সাথে সুহৃদ চাকমার বিয়ে হয়। জাহাঙ্গীরনগর হতে স্নাতকোত্তর পাশের পর তিনি শ্রীমৎ বিমল তিষ্য ভিক্ষু, শ্রীমৎ প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু প্রমূখদের পরিচালিত দিঘীনালার বোয়ালখালী পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম হাই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।তিনি অবশ্য চেয়েছিলেন মোনঘরে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করতে কিন্তু সে সময় মোনঘরে শিক্ষকের কোনো পোস্ট খালি না থাকায় তিনি বোয়ালখালীতেই যোগদান করেন। পরে তিনি সেখান থেকে মোনঘর শিশু সদনে সস্ত্রীক যোগদান করেন। পরবর্তীতে মোনঘরে কাজ বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসনে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে তিনি দায়িত্ব নেন। তিনি মোনঘরের “মৈত্রী ভবন” এর তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বও পালন করেছিলেন। একবার তিনি আর মঙ্গলকুমার চাকমা উসাইকে (উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট) একটি চাকমা নাটক মঞ্চায়ন করার কথা দিয়েছিল। তখনকার মোনঘরের আরেক শিক্ষক শান্তিময় চাকমাকে বলেছিলেন একটি নাটক লিখে দিতে কারণ সেই সময় মঞ্চায়ন করা যায় এমন নাটক তাদের হাতে ছিল না। শান্তিময় বাংলা সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন, শান্তিময় চাকমা ব্রিটিশ নাট্যকার উইলিয়াম কংগ্রীভ এর “দ্যা ওয়ে অফ দ্যা ওয়্যাল্ড” এর ছায়া অবলম্বনে CHT এর প্রেক্ষাপটে “ যে দিনোত যে কাল” লিখেছিলেন। যা ১৯৮৪ সালের ফুলবিজুতে টাউন হলে নাটকটি মঞ্চায়িত হয়।

তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ “বার্গী” ১৯৮৭ সালে জুম ঈস্থেটিকস কাউন্সিল কতৃক প্রকাশিত হয়। তিনি জুমিয়া ভাষা প্রচার দপ্তর (জুভাপ্রদ) প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি একাধারে একজন প্রাবন্ধিক, গল্পকার, সমালোচক ছিলেন। সুহৃদ চাকমা ৯ টি প্রবন্ধ, ৪ টি গল্প, ১ টি কাব্য গ্রন্থ রচনা করেন।

সৃষ্টিশীল, প্রতিভাবান একজন সংগঠক সুহৃদ চাকমা বেঁচেছিলেন মাত্র ৩০ বছর। চাকমা সাহিত্য ক্ষণজন্মা এই কবি নান্দনিকতার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সুহৃদ চাকমা ১৯৮৮ সালের ৮ আগস্টের রাতে নিখোঁজ হন। সৃষ্টিশীল এই তরুন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন, চাকমা সাহিত্যে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

তথ্যসূত্রঃ

১। সুহৃদ চাকমা স্মারক গ্রন্থ-  জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিল (২০০৫)

২। এক তেত্রিশ বছর বয়সীকে নিয়ে দুটি কথা- প্রশান্ত ত্রিপুরা (আলুটিলা ছাড়িয়ে)  

 480 total views,  2 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published.