টংক আন্দোলন ও হাজংমাতা রাশিমনি’র সংগ্রাম

The Talop Desk

টংক আন্দোলন কি?

টংক আন্দোলন ব্রিটিশ ভারতের সর্বশেষ গণআন্দোলন। টংক মানে ধান কড়ারি খাজনা। টংক আন্দোলন প্রকৃতপক্ষে কৃষক আন্দোলন। টংক প্রথার শর্তানুসারে জমিতে ফসল হোক বা না হোক চুক্তি অনুযায়ী টংকের ধান জমির মালিককে দিতেই হতো। ফলে দেখা যায়, কোন বছর যদি জমিতে ফসল না হয় বা খরা, প্রাকৃতিক দূর্যোগে ফসল নষ্ট হয়ে যায়, তবুও কৃষককে তার নির্ধারিত খাজনা পরিশোধ করতে হতো। টংক অনুসারে সোয়া একর জমির জন্য বছরে সাত থেকে পনের মণ ধান দিতে হতো। কিন্তু সেই সময় জোত জমির খাজনা ছিল সোয়া একরে পাঁচ থেকে সাত টাকা মাত্র। ফলে প্রতি সোয়া একরে কৃষকদের বাড়তি ১১ থেকে ১৭ টাকা খাজনা দিতে হতো। ময়মনসিংহ জেলার উত্তরে কলমা কান্দা, দুর্গাপুর, হালুয়া ঘাট, নালিতা বাড়ী ও শ্রীবর্দ্দি থানায় এই প্রথা প্রচলিত ছিল।

Hajong Mata Rashimoni Monument

আন্দোলনের ইতিহাস-

এক সময় সুস্বং জমিদাররা ছিল গারো পাহাড়ের বিপুল অরণ্য সম্পদের মালিক। গারো পাহাড়ে প্রচুর কয়লা এবং মূল্যবান খনিজ পদার্থ পাওয়া যেত। মূল্যবান কাঠ এবং বাঁশও সেখানে প্রচুর পরিমাণে জন্মাত। বনে “আগর” নামক এক প্রকার সুগন্ধি কাঠ পাওয়া যেতো । কস্তুরির মতো সুগন্ধি ছড়াতো এই কাঠ । এই কাঠ থেকে চোলাই করে তৈরি হতো সুগন্ধি তৈল । আগর কাঠ থেকে জমিদাররা প্রচুর অর্থ আয় করতো। তাছাড়া পাহাড়ে ছিল বন্যহাতি । আঠারো এবং উনিশ শতকে হাতির ছিল অভাবনীয় কদর । সুস্বং রাজারা বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে বন্য হাতি ধরার আয়োজন করতো। প্রচলিত ভাষায় এর নাম হাতি খেদা (হাতি ধরার ফাঁদ)। সুস্বং রাজা কিশোর হাতিগুলোকে পোষ মানিয়ে দিল্লি, আগ্রা, পাটনা ও মর্শিদাবাদসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে প্রচুর অর্থ আয় করতো । খেদা দিয়ে হাতি ধরার কাজে ব্যবহার করতো হাজং শ্রমিকদের । হাজংরা ছিল খুবই সাহসী, শক্তিশালী এবং দুর্ধর্ষ । হাতি ধরার কাজে তারা ছিল অত্যন্ত পটু । বন্য হাতি ধরতে গিয়ে অনেক হাজং শ্রমিককে অকালে প্রাণ দিতে হতো। কিন্তু হাতি ধরতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের ওপর চালানো হতো অমানুষিক নির্যাতন। শত নির্যাতন সহ্য করে নাম মাত্র পারিশ্রমিক পেয়েও যুগ যুগ ধরে তারা হাতি ধরার কাজ করেছে। একসময় মনা সর্দারের নেতৃত্বে দূর্গাপুরের হাজং ও গারোরা বিদ্রোহ করে যা ইতিহাসে “হাতিখেদা বিদ্রোহ” নামে পরিচিত। দীর্ঘ ৫ বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৮৮৪ সালে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয় হাতিখেদা আইন তুলে নিতে। অন্যদিকে, ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টি পড়ে গারো পাহাড়ের ওপর। সরকার গারো পাহাড়কে সরকারী অধিগ্রহণে আনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ব্রিটিশ সরকার জমিদারদের নোটিশ দিয়ে জানিয়ে দেয়, পাহাড়ের ওপর জমিদারদের আইনগত কোন অধিকার নেই। জমিদাররা সরকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। মুঘল আমলের সনদের কারণে হাইকোর্টে জমিদাররা জয়লাভ করে। সরকার প্রিভি কাউন্সিলে (বৃটেনের উচ্চ আদালত) আপিল করে। ব্রিটিশ সরকার যখন জানতে পারে মামলায় জমিদাররাই জিতে যাবে, তখন “গারো হিল এক্ট” নামে ১৮৮৫ সালে একটি আইন করে পাহাড়ের ওপর থেকে জমিদারদের স্বত্ত্ব কেড়ে নেয় । আরও আইন করে যে, এই এক্টের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না। গারো পাহাড় জমিদারদের হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ফলে তারা আয়ের বিকল্প পথ খুঁজতে থাকে।

এরপর, সুস্বং জমিদাররা জমির খাজনা আদায়ে বিশেষ মনোযোগী হয়ে ওঠে । প্রবর্তন করে টংক প্রথার। টাকার পরিবর্তে ধান দিয়ে যে খাজনা পরিশোধ করা হতো তার নাম টংক। টংক প্রথার শর্তানুসারে জমিতে ফসল হোক বা না হোক চুক্তি অনুযায়ী টংকের ধান জমির মালিককে দিতেই হতো। দেখা যায় কোন বছর যদি জমিতে ফসল না হয় বা খরা, প্রাকৃতিক দূর্যোগে ফসল নষ্ট হয়ে যায় তবুও কৃষককে তার নির্ধারিত খাজনা পরিশোধ করতে হতো। টংক অনুসারে সোয়া একর জমির জন্য বছরে সাত থেকে পনের মণ ধান দিতে হতো। কিন্তু সেই সময় জোত জমির খাজনা ছিল সোয়া একরে পাঁচ থেকে সাত টাকা মাত্র। ফলে প্রতি সোয়া একরে কৃষকদের বাড়তি ১১ থেকে ১৭ টাকা খাজনা দিতে হতো। ময়মনসিংহ জেলার উত্তরে কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, হালুয়াঘাট, নালিতা বাড়ী ও শ্রীবর্দ্দি থানায় এই প্রথা প্রচলিত ছিল। এই প্রথা শুধু জমিদারদের ছিল তা নয়, মধ্যবিত্ত ও মহাজনরাও টংক প্রথায় লাভবান হতো। একমাত্র সুস্বং জমিদাররাই টংক প্রথায় দুই লাখ মণ ধান সংগ্রহ করতো। সুস্বং জমিদাররা গারো পাহারের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে সম্ভবত এই প্রথা প্রবর্তন করে। জোত স্বত্ত্বের জমির বন্দোবস্ত নিতে হলে সোয়া একরে একশত টাকা থেকে দুইশত টাকা নজরানা দিতে হতো। গরিব কৃষক এই নজরানার টাকা দিতে সমর্থ ছিল না, টংক প্রথায় কোন নজরানা লাগত না। কাজেই গরিব কৃষকের পক্ষে টংক নেয়াই ছিল সুবিধাজনক। টংকের হার প্রথমে এত বেশী ছিল না। কৃষকরা যখন টংকের জমি নেয়ার জন্য এগিয়ে আসে তখন প্রতি বছর জমির হার নিলামে ডাকা হতো । ফলে তা ক্রমে ক্রমে বেড়ে যায়। যে কৃষক বেশি ধান দিতে রাজি হতো তাকেই অর্থাৎ পূর্বের ডাককারী কৃষকের কাছ থেকে জমি ছাড়িয়ে নতুন সর্বোচ্চ ডাককারীর কাছে হস্তান্তর করা হতো। এভাবে নিলামে ডাক বেড়ে ক্রমে ১৯৩৭ সাল থেকে সোয়া একরে ১৫ মণ পর্যন্ত ওঠে। টংক প্রথা নিয়ে হাজং প্রজা ও জমিদারদের মধ্যে বিভিন্ন অসন্তোষ দানা বাঁধছিল, যা ক্রমে প্রকট রূপ লাভ করে। হাজং নেতৃবর্গের একটাই দাবি ছিল, ‘জান দিবে কিন্তু ধান দিবে না’। টংক প্রথা নিয়ে বিরোধিতার জন্যই ‘গোড়া চাঁদ’ হাজংসহ চারজনকে জেলে যেতে হয়। বছর তিনেক পর তিনজন ফিরে এলেও ‘গোড়া চাঁদ’ ফেরেনি। গোড়া চাঁদের না ফিরে আসার ক্ষোভে জমিদারদের লাঠিয়াল ও সৈন্য বাহিনীর সঙ্গে হাজং প্রজাদের বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ বেধে যায়। সে সময় কমরেড ‘মণি সিংহ’ কলকাতা থেকে নিজ বাড়ি সুস্বং দুর্গাপুরে মা’য়ের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। পরে, মণি সিংহ এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হলে টঙ্ক আন্দোলন বেগবান হয়।

Comrade Moni Singha

১৯৩৭ সালের দিকে রাশিমণি হাজং টংক আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। তিনি টংক আন্দোলনের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্য হন। রাশিমণি ছিলেন এ আন্দোলনের অন্যতম বিপ্লবী নেতা। অন্যান্য নারী প্রজারা রাশিমণিকে দেখেই আন্দোলনে উৎসাহিত হন। অনেকেই টংক আন্দোলন বাহিনীতে যোগ দান করেন। ধীরে ধীরে হাজং নারী-পুরুষের ঐক্যে টংক আন্দোলন ব্রিটিশদের ভীত করে তোলে। শোষিত কৃষকেরা এই প্রথার বিরুদ্ধে কমরেড মণি সিংহের নেতৃত্বে একত্রিত হয়।

১৯৩৭ সালের নভেম্বর মাসে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এখান থেকেই মূলতঃ আন্দোলনের শুরু। এরপর কমরেড মণি সিংহ ছয় দফা দাবিনামা প্রস্তুত করেন। ছয়দফা ছিলো-

১। টংক প্রথার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি

২। টংক কৃষকদের ভূমি  অধিকারের স্বীকৃতি

৩। পরগনায় নগদ টাকায় দেয় হারের নিরিখে খাজনা নির্ধারণ

 ৪। টংক খাজনার বকেয়া দাবি না করা

৫। জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি এবং

৬। সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছেদ

কিন্তু ব্রিটিশ সরকার আন্দোলনকারীদের উপর চড়াও হয়। যার ফলশ্রুতিতে আন্দোলন আরও তীব্র হতে থাকে। এই প্রথা রুখে দেওয়ার জন্য আন্দোলনকারীরা আরো বেশি সংগঠিত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যায়। মণি সিংহের নেতৃত্বে ১৯৪০ সালে আন্দোলনের তীব্রতা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পায়। ওই বছর সরকার সার্ভে করে টংকের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। ১৯৪১ সালের জানুয়ারী মাসে গভর্নর টংক এলাকার অবস্থা স্বচক্ষে দেখতে এলে পূর্বাহ্নে কয়েকজন সহকর্মীসহ মণি সিংহকে গ্রেপ্তার করে ১৫ দিন আটক রাখে। ছাড়া পেয়ে পরিস্থিতি বুঝে কমরেড মণিসিংহ আত্মগোপন করেন। ওই বছর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও এই যুদ্ধেকালে কমিউনিস্ট পার্টি আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদ বিরোধী ‘জনযুদ্ধের’ নীতি গ্রহণ করায় টংক আন্দোলন কিছু দিনের জন্য বন্ধ থাকে। এক পর্যায়ে ব্রিটিশ সরকার টংক প্রথার সংস্কার করলেও প্রথাটি একবারে উচ্ছেদ করেনি। আন্দোলন নেতৃত্বদানকারী সংগঠন কৃষক সভা ‘টংক’ প্রথার পুরোপুরি উচ্ছেদ করার জন্য আন্দোলন অব্যহত রাখে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্যাসীবাদবিরোধী গণসংগ্রামের সময় রাসমণি ‘মহিলা অত্মরক্ষা সমিতিতে যোগ দেন। এই সমিতির হয়ে, রাসমণি, তেরশো পঞ্চাশের মন্বন্তরে লঙ্গরখানা খুলে তিনটি গ্রামের গরীব মানুষের মুখে অন্ন জোগানোর ভার নেন। তাঁর নেতৃত্বে খাদ্য সংগ্রহকারী দল সারাপরগনা ঘুরে ধান, চাল, অর্থ ও বস্ত্র সংগ্রহ করতো। হাজং চাষীদের দল চোরা ব্যবসায়ী মজুতদারদের গোপন খাদ্যের গুদাম খুঁজে বের করে সেই খাদ্য লঙ্গরখানার জন্য নিয়ে আসতো।

হাজং অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ করার জন্য যে (‘বেশি খাদ্য ফলাও’ ‘খাল কাটা, বাঁধ বাঁধা’) আন্দোলন আরম্ভ হয় তার পুরোভাগে ছিলেন রাসমণি। ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির নির্দেশে রাসমণি নিজের গ্রামে ধর্মগোলা (যেখানে ফসল ওঠার সময় সকলে উদ্বৃত্ত ধান জমা দিত এবং প্রয়োজনের সময় সেখান থেকে ধান নিত) এবং মেয়েদের জন্য নানা কুটির শিল্পের কেন্দ্র স্থাপন করেন। রাসমণি বুঝতে পারেন, জমিদার, তালুকদার এবং মহাজনদের হাতে হাজং চাষীদের শোষিত হওয়ার প্রধান কারণ তাদের অশিক্ষা। সেই সমস্যা দূর করার জন্য তিনি একটি নৈশ বয়স্ক বিদ্যালয় খোলার উদ্যোগ নেন। এই নৈশ বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি চলতো রাজনৈতিক আলোচনা। কিছুদিনের মধ্যেই লাঞ্ছিত ও অনগ্রসর হাজং ঘরের মেয়ে রাসমণি গণচেতনায় উদ্বুদ্ধ এক বিপ্লবী দল গড়ে তোলেন। এভাবে তিনি ময়মনসিংহের সীমান্ত এবং পার্বত্য অঞ্চলের নারী আন্দোলনের নেত্রী হয়ে উঠেন।

১৯৪৬ সালে দ্বিতীয় দফায় টংক আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনকে জোরদার করার জন্য পহেলা জানুয়ারী সুস্বং-দুর্গাপুর স্কুলের মাঠে এক বিশাল জনসভা হয়। এ সভায় বল্লভী বকসীর নেতৃত্বে হাজার পাঁচেক কৃষকদের এক মিছিল সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করে সভাস্থলে এসে পৌঁছায়। এ মিছিলে রাসমণি হাজংসহ প্রায় একশত হাজং নারী সংঘবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করে।

 এ সভার উদ্দেশ্য ছিল–

১। পুনরায় টংক উচ্ছেদের পক্ষে আন্দোলন শুরু।

২। ময়মনসিংহ শহরে ভিয়েতনাম দিবসে পুলিশের গুলিতে নিহত ছাত্রনেতা অমলেন্দু রায়ের হত্যার প্রতিবাদ করা।

এই সম্মেলনের খবর পৌছে যায় ময়মনসিংহের পুলিশ দপ্তরে। পুনরায় মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা টংক আন্দোলনের গতিকে থামিয়ে রাখার লক্ষ্যে সরকারি সশস্ত্র পুলিশবাহিনী তৎপর হয়ে ওঠে। ওই দিনই ময়মনসিংহের পুলিশ দপ্তর দুর্গাপুর থানার বিরিশিরিতে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল বাহিনী সশস্ত্র ক্যাম্প স্থাপন করে। বিভিন্ন গ্রামের হাজং পরিবারগুলো প্রতিদিনই সশস্ত্র বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের শিকার হতো। এ সশস্ত্র বাহিনী বিভিন্ন গ্রামে হানা দিয়ে বিদ্রোহী হাজং কৃষকসহ অন্যান্য কৃষকদের খুঁজতে শুরু করে। সে লক্ষ্যে ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি সকাল ১০ টার দিকে ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল্স বাহিনী বিরিশিরি থেকে চার মাইল উত্তরে বহেরাতলী নামক গ্রামে তল্লাশি চালায়। কিন্তু এইদিন  গ্রামের বিদ্রোহী কৃষক নর-নারীরা প্রতিবেশিদের টংক বিরোধী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করার কাজে পাশের গ্রামে চলে গিয়েছিল। অবশেষে বহেরাতলী গ্রামে কাউকে না পেয়ে ক্ষিপ্ত পুলিশ বাহিনী লংকেশ্বর হাজংয়ের সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী কুমুদিনী হাজংকে ধরে বিরিশিরি ক্যাম্পের দিকে রওনা হয়। রাশিমণি হাজং ও হাজং কৃষকদের মাঝে এ সংবাদটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে শতাধিক হাজং নারী-পুরুষ সশস্ত্র বাহিনীর পথরোধ করে। এ সময় বিপ্লবী রাশিমণি হাজং তার দলবলসহ কুমুদিনী হাজংকে বাঁচাতে পুলিশ বাহিনীর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সে সময় তিনি বজ্রকণ্ঠে বলেন- ‘ময় তিমাদ, একজন তিমাদ হুইয়া ময় আরেগা তিমাদলা মান বাচাবো, মুরিবা লাগে মুরিব” হাজংভাষায় বলা এ কথার অর্থ হচ্ছে-“আমি নারী, নারী হয়ে আরেক নারীর সম্ভ্রম রক্ষা আমিই করবো, মরতে হয় মরব।” পুলিশ বাহিনীও নৃশংসভাবে তাদের ওপর গুলি চালায়। ফলে যুদ্ধের একপর্যায়ে পেছন থেকে আসা গুলিতে রাশিমণি হাজং মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। নারী হয়ে নারীর সম্ভ্রম রক্ষার্থে জীবন উৎসর্গ করা ইতিহাসে বিরল। টংক প্রথার ফলে নিপীড়ন ও অত্যাচারের শিকার হওয়া কৃষকদের আন্দোলনে রাশিমণি হাজংয়ের লড়াই, রাশিমণিকে হাজং জনগোষ্ঠীর কাছে ‘হাজংমাতা’ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। রাশিমণি হাজং টংক আন্দোলনের প্রথম শহীদ নারী।  অন্যদিকে,পুরুষ দলের নেতা সুরেন্দ্র হাজং রাশিমণিকে ধরতে গেলে তাকেও নির্দয়ভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় অন্যান্য হাজং নারী পুরুষ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং সশস্ত্র পুলিশের উপর বল্লম ও রামদা দিয়ে হামলা চালায়। পুলিশ বাহিনীর দু’জন ঘটনাস্থলেই মারা যায়। বাকি পুলিশ দৌঁড়ে পালায়।

১৯৪৯ সালে এই আন্দোলন বিশাল আকার ধারণ করে। ‘টংক প্রথার উচ্ছেদ চাই, জান দিব তবু ধান দিব না, জমিদারী প্রথার উচ্ছেদ চাই, জমি যার লঙ্গল তার’  ইত্যাদি স্লোগানে পাহাড়ী এলাকার সব চাষী আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ে এবং টংক দেওয়া বন্ধ করে । ১৯৪৯ সালের ১৫ জানুয়ারি কলমাকান্দা থানার বটতলায় ২০ মণ টংক ধান আটক করে কৃষকেরা। পরদিন পুলিশ গরুর গাড়িতে করে জোর করে ধান নিয়ে যেতে চাইলে কৃষকরা গাড়ির পথরোধ করে দাড়ায়। পুলিশ লাঠি চালিয়ে কয়েকজনকে আহত করে। পাল্টা আঘাত হয় পুলিশের ওপর। পাল্টা আক্রমণে টিকতে না পেরে পুলিশ পালিয়ে যায়। ২৬ ফেব্রুয়ারি চৈতন্যনগরে জমিদারের কাছারি দখল করে উত্তেজিত কৃষকেরা। পুড়িয়ে দেয় জমিদারের প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র। অত্যাচারের খড়গ নেমে আসে তাদের উপর। বিপ্লবী মঙ্গল সরকারের নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী একদল স্বেচ্ছাসেবক লেঙ্গুরা বাজারে মিছিল করে যখন টংক বিরোধী স্লোগান দিতে থাকে, ক্যাম্পের পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে ১৯ জন বিদ্রোহী নিহত হন, গ্রেপ্তার হন অনেকে। এর মধ্যে অশ্বমণি ও ভদ্রমণি হাজং এর ১২ বছর করে জেল হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি দু’জন বন্ধুকধারী সিপাইকে বিপ্লবী কৃষকেরা ভালুকা পাড়া গির্জার সামনে হত্যা করে। অবশেষে ১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন সুসং দুর্গাপুরে এসে টংক প্রথা উচ্ছেদ ও কুষকদের জমির স্বত্ত্ব দেওয়ার আশ্বাস দেন । অন্যদিকে হাজং এলাকায় সশস্ত্র পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করে । তারা হাজং কৃষকদের ঘরে ঘরে লুটতরাজ চালায়, নারীদের সম্রমহানি ও শতশত পুরুষকে ধরে জেলে দেয় । কিন্তু আন্দোলন কিছুতেই স্তিমিত হচ্ছিল না । অবশেষে ১৯৫০ সালের মাঝামাঝিতে মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন জমিদারী ও টংক প্রথা উচ্ছেদের সরকারী ঘোষণা দেন । অতঃপর ১৯৫০ সালেই প্রাদেশিক পরিষদে জমিদারী উচ্ছেদ আইন পাশ হয়। সেই সঙ্গে টংক প্রথার চির অবসান হয়।

 8 total views,  8 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published.