সইং নৃত্য: মারমা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী এক নৃত্যর কথা

Bhubon Chakma

বাংলাদেশে ৪৫ টির অধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস। তার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৩টি আদিবাসী জনগোষ্ঠী বসবাস করে। প্রত্যেক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রয়েছে আলাদা আলাদা নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের মধ্যে জনসংখ্যায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মারমা জনগোষ্ঠী। মারমা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ঐতিহ্যে ভরপুর। তার মধ্যে মারমা জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান হলো “সইং নৃত্য “। এটি মূলত সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে উদযাপন করা হয়। যিনি জীবিত অবস্থায় সমাজিক, ধর্মীয়  বিভিন্ন  কাজে অবদান রেখে যান এবং মৃত্যুর পর সেই ব্যক্তিকে সম্মান প্রদর্শন পূর্বক এই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরুকে ( বৌদ্ধ ভিক্ষু) মৃত্যুর পর দাহকার্য সম্পাদন করার পূর্বে এই “সইং নৃত্যের” আয়োজন করা হয়।মারমারা মনে করে, একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু জাতির জন্য অনেক মহৎ কার্য সম্পাদন করে যান। সেই বৌদ্ধ ভিক্ষুর মৃত্যুর পর সদগতি কামনা করা হয় এই নৃত্যের মাধ্যমে। শুধুমাত্র বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ক্ষেত্রে নয়, যারা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখে যান অনেক সময় তাদের সম্মান প্রদর্শনের জন্যেও এটির আয়োজন করা হয়।

“সইং নৃত্য” মূলত একটি দলগত নৃত্য। এই দলে ১৬ জনের অধিক সদস্য থাকে। তবে সইং নৃত্যে ১৬ জন সদস্য এবং একজন দলপতি অংশগ্রহন করে থাকে। এছাড়াও বাদকের একটি দল থাকে আর সেই বাদকের বাজনার তালে তালে এই নৃত্য পরিবেশিত হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, যারা নৃত্যে অংশগ্রহন করে তাদের কাঠ এবং বাঁশের তৈরি একটি ঘর কাঁধে নিয়ে নাচতে হয়। দলপতি বাঁশি বাজিয়ে বাজনার তালে তালে নর্তকীদের বিভিন্ন সংকেত প্রদান করেন। যতক্ষণ পর্যন্ত কাঁধে থাকা ঘরটি ভেঙে না যায় ততক্ষণ পর্যন্ত নৃত্যটি চালিয়ে যেতে হয়। এই নৃত্য পরিবেশনের জন্য যথেষ্ট প্রশিক্ষণ, ধৈর্য, শক্তি ও মনোবলের প্রয়োজন হয়।  তাই যারা এই “সইং নৃত্য” চর্চা করে তারাই মূলত নৃত্যে অংশগ্রহন করে থাকে। এই নৃত্য দেখার জন্য অনেক দূর দূরান্ত থেকে মানুষের সমাগম হয়। অনেক আগ্রহ নিয়ে অনুষ্ঠানটি সকলে উপভোগ করে। অনুষ্ঠানের দিন সকালে একবার আর মৃত ব্যক্তিকে সৎকারের পূর্বে একবার এই নৃত্য পরিবেশন করা হয়।

বর্তমানে এটি শুধুমাত্র মারমা জনগোষ্ঠীর বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দাহকর্ম সম্পাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও তাদের ধর্মীয় গুরুর মৃত্যুর সদগতি কামনায় এটির আয়োজন করে থাকে। সেক্ষেত্রে মারমা জনগোষ্ঠীদের যারা “সইং নৃত্য” চর্চা করে, তাদেরকে নৃত্য পরিবেশনের জন্য নিয়ে আসতে হয়।

সইং নৃত্য শুধুমাত্র একটি নৃত্য নয়, এটি আদিবাসী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যর বাহক। সংস্কৃতির আগ্রাসনের কারণে হয়ত এসব ঐতিহ্যর পরিচয়ের বাহক একদিন হারিয়ে যাবে যদি না এটিকে ধারণ করে লালিত ও চর্চা করা হয়। সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন নিজের সংস্কৃতিকে জানা এবং সংস্কৃতির গুরুত্বকে অনুধাবন করা।

 40 total views,  2 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published.